হাঁপানীঃ কিছু ভূল ভাবনা
স্মৃতির ঘুম খুব ভোরে ভেঙ্গে গেল।
সারাটা বুক আটসাট হয়ে চেপে আছে,
সঙ্গে কাশি, শ্বাস নিতে খুব কষ্ট।
বুকের ভিতর সাঁ সাঁ করে শব্দ হচ্ছে,
হা করে শ্বাস নিচ্ছে সে। জালানাটা
খুলে সিলিং ফ্যানটা ফুলস্পীডে
চালিয়েও লাভ হচ্ছে না। কয়েকবার
ইনহেলার নিয়েছে। দুনিয়ার এত
প্রাকৃতিক অক্সিজেন তবুও
অক্সিজেনের জন্য শরীর ভেঙ্গে
পড়ছে।
ছোট বেলা হতেই সে হাঁপানীতে
ভুগছে। ব্রংকিয়াল অ্যাজমা বাংলায়
হাঁপানী এটাই হল হাঁপানী বা অ্যাজমা
নামে জনসাধারনের নিকট বহুল
পরিচিত (একটি রোগ)। বাংলাদেশে
প্রথম জাতীয় জরিপ অনুযায়ী
বাংলাদেশে ৭০ লক্ষ মানুষ হাঁপানীতে
ভুগছে। এদের ভিতর বিরাট অংশ
অসহায় শিশু আর বৃদ্ধ। যে কোন
মানুষেরই যে কোন বয়সে এই রোগ
হতে পারে। তবে হাঁপানী কোন
ছোয়াচে রোগ নয়। অনেক সময় এই
রোগ বংশানুক্রমে চলে।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি এই
রোগের সম্পূর্ণ নিরাময়ের কোন ওষুধ
এখানো বের হয়নি। কিন্তু সঠিক
চিকিত্সায় এই রোগ ডায়াবেটিস ও
উচ্চ রক্তচাপ (হাই প্রেসার) এর
ন্যায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা
সম্ভব। সঠিক চিকিত্সা না হলে এর
দরুন মানুষ শুধু প্রতিদিনই কষ্ট পায়
না অধিকন্ত এই রোগ মৃত্যুর
কারণ হয়ে দাড়ায়। বাংলাদেশে
হাঁপানী তার চিকিত্সা নিয়ে সম্ভবতঃ
সব্বোর্চ কুসংষ্কার ও অপচিকিত্সা
রয়েছে যা শুধু রোগের তীব্রতাই বৃদ্ধি
করে না, সেই সাথে অনেক ক্ষেত্রে
রোগীকে মৃত্যুর মুখেও ঠেলে দেয়।
তাছাড়া হাঁপানীর কারণে বহু মেয়ের
বিয়ে হতে চায় না, কিংবা হলেও
অনেক যৌতুকের বিনিময়ে বাবা মা
রোগগ্রস্থ কন্যাকে বিয়ে দেন ও
কারও কারও বিয়ে ভেঙ্গেও যায়।
আবার অন্যদিকে হাঁপানী নিয়ে
প্রতিবার বেশ কিছু সংখ্যক খেলোয়ার
অলিম্পিক পদকও জয় করেছেন।
হাঁপানী, কুসংষ্কারের মধ্যে অন্যতম
হলো যে এর ডাক্তারী চিকিত্সা নেই।
কেউ কেউ মধু ও ছাগলের দুধও খেয়ে
থাকে। কেউ কেউ আবার হাকিম,
কবিরাজের নিকট কিংবা পীরের কাছ
থেকে পানি পড়া নিয়ে ভাল হতে চায়।
অনেক কবিরাজ ও হাকিম তাদের
ওষুধে উচ্চমাত্রায় ষ্টেবয়েড প্রদান
করে থাকে যা শরীরের জন্য ভীষণ
ক্ষতিকর। হাঁপানীর অন্যতম প্রধান
অপচিকিত্সা হলো ক্রমাগত ষ্টেরয়েড
বড়ি খাওয়া, এতে করেও যদিও দ্রুত
হাঁপানী নিয়ন্ত্রণে আসে কিন্তু দীর্ঘ
মেয়াদে ডাযাবেটিস, অস্থিক্ষয়, উচ্চ
রক্তচাপ, কুশিং সিনড্রোম্ হয়। তখন
কয়েকদিন ষ্টেরয়েড না গ্রহণ করার
জন্য
রোগী অজ্ঞান হতে পারে, এমনকি
মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়তে পারে।
অথচ চিকিত্সা বিজ্ঞান হাঁপানীর
ষ্টেরয়েড প্রদানের সুনিদিষ্ট ধাপ
রয়েছে; ষ্টেরয়েড প্রদানের মেয়াদ
নির্ধারন করা হয়েছে এমনকি দীর্ঘদিন
ষ্টেরয়েড হতে কি করে
ষ্টেরয়েডবিহীন থাকা যায় তার
ব্যবস্থাও রয়েছে।
হাঁপানীর কুসংষ্কার কিংবা সচেনতার
অভাবের মধ্যে একটি হলো ইনহেলার
ব্যবহার করা কিংবা ইনহেলার ব্যবহারে
ভয় পাওয়া। বেশীর ভাগ লোক
ইনহেলারকে শেষ চিকিত্সা মনে করে
অথচ ইনহেলার হাঁপানীর সর্বোত্তম
চিকিত্সা ব্যবস্থা যা অল্প/তীব্র
হাঁপানীর জন্য আদর্শ চিকিত্সা। সেই
সাথে ইনহেলার এর পার্শ্ব
প্রতিক্রিয়া মুখে খাওয়ার ওষুধের
চাইতে নাই বললেই চলে।
হাঁপানীর আর একটি অপচিকিত্সা
হলো দীর্ঘদিন চিকিত্সা গ্রহণ না
করা অথচ বৈজ্ঞানিকভাবে এটা
স্বীকৃত যে হাঁপানী একটি ক্রনিক/
দীর্ঘস্থায়ী রোগ যার অল্প বিস্তর
চিকিত্সা সারা বছর ধরেই নিতে হবে।
নতুবা শ্বাস নালীতে স্থায়ী পরিবর্তন
হতে যেতে পারে, যার ফলে মৃদ্র
হাঁপানী তীব্র হাঁপানীতে রূপ নিতে
পারে, যার ফলে চিকিত্সার
কার্যকারীতা হ্রাস পায় ও উচ্চ
মাত্রায় ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। এর
ফলে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও বেড়ে যায়।
হাঁপানী চিকিত্সার আরো একটি
অতিমাত্রায় যে ভুল হয়ে থাকে তা
হল ষ্টেরয়েড ইনহেলার ব্যবহার না
করে ঘন ঘন সালবুটামল ইনহেলার
ব্যবহার করা। অথচ ষ্টেরয়েড
ইনহেলার হাঁপানী প্রতিরোধক এবং
দীর্ঘ মেয়াদে রোগীকে স্বাভাবিক
রাখে।
অতিরিক্ত সালবুটামল ইনহেলার
রোগীকে অনেক সময় যথাযথ
চিকিত্সার পরিবর্তে বিলম্ব হওয়ার
জন্য মৃত্যুর ঝুকির দিকে ঠেলে দেয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন