Drop Down MenusCSS Drop Down MenuPure CSS Dropdown Menu

হূদরোগের ঝুঁকি কমাতেদাঁতের যত্ন নিন

হূদরোগের ঝুঁকি কমাতে দাঁতের যত্ন নিন




সম্প্রতি কয়েকটি গবেষণা কাজ
ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের জন্য হূদরোগে
আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে
একটি জরুরী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
এতদিন আমরা যেমন জর্দ্দা
ব্যবহারকারী এবং ধূমপায়ীকে
তামাকের সঙ্গে হার্টের অসুখ বা
স্ট্রোক সম্পর্কে সচেতন করতে
চেয়েছি তেমনি এখন হয়ত তার সঙ্গে
যুক্ত হচ্ছে দাঁতের পরিচর্যার
বিষয়টি।
লন্ডন ইউনির্ভাসিটি কলেজের
অধ্যাপক রিচার্ড ওয়ার্ট এবং তার
একদল গবেষক সমপ্রতি ১১ হাজার
প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের উপর এক
জরিপ চালিয়ে গবেষণায় উল্লেখ
করেছেন যে, মুখ ও দাঁত পরিষ্কার
থাকলে হার্টের ঝুঁকি কমে যায়।
গবেষণায় দেখা যায় দুই- তৃতীয়াংশ
মানুষ দিনে অন্তত দু’বার দাঁত ব্রাশ
করে।
এই গবেষণায় সেই সমস্ত মানুষের
গড়ে আট বছরের জীবন যাপন
সম্পর্কে খোজ খবর, তাদের
চিকিত্সার ইতিহাস সেই সাথে কখনো
হার্টের অসুখ হয়েছিল কিনা, উচ্চ
রক্তচাপ, রক্তের গ্রুপ, এবং প্রতিদিন
কতবার দাঁত ব্রাশ করতেন সেগুলো
তথ্য সংগ্রহ করা হয়। অন্যদিকে
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার অরলেন্ডের
আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশনের
সভায় প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয় যারা
নিয়মিত ডেন্টাল সার্জন এর কাছে
যান ও দাঁতের চিকিত্সা করান এবং
পরিচর্যা করান তাদের হূদরোগে
আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ২৮% কমে
যায় এবং স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার
ঝুঁকি ১৩% কমে যায়।
তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে একটি
ভেটেনারস জেনারেল হাসপালের
গবেষক দলের প্রধান হূদরোগ
বিশেষজ্ঞ এমিলি (জু-ইন) চেন গত
সাত বছর ধরে লক্ষাধিক লোকের
দাঁতের পরিচর্যার বিষয়টি গবেষণা
করেন। গবেষণায় তারা দুই বছরের
মধ্যে কে কতবার ডেন্টাল সার্জনকে
দিয়ে দাঁতের চিকিত্সা ও পরিচর্যা
করেছেন তাও পর্যবেক্ষণ করেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, মানবদেহের
প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরস্পরের
সঙ্গে সম্পৃক্ত। অতএব একটি
অঙ্গের সমস্যা বা প্রদাহ হলে
অন্যান্য অঙ্গের উপর তার প্রভাব
পড়ে। অন্যদিকে একটি অঙ্গের
সুস্থতায় অন্য অঙ্গও সুস্থ্য থাকে।
আরেকটি বিষয় গবেষণায় বলা হয়েছে
যারা নিয়মিত দু’বেলা দাঁত ব্রাশ করেন
তাদেরও হার্টের অসুখ কম হয়। কারণ
তাদের দাঁতের ও মাড়ির প্রদাহ হয় না
বা কম হয়।
গবেষণায় উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো
মুখের ভিতরের দাঁত ও মাড়ির রক্তের
ধমনির সাথে হার্টের ধমনির বা
রক্ত প্রবাহের সরাসরি যোগসুত্র
রয়েছে। নিয়মিত দাঁতের যত্ন না
করলে বা দাঁত ব্রাশ না করলে অথবা
মাড়ির রোগ ও ডেন্টাল ক্যারিজ
রোগ বিনা চিকিত্সায় থাকলে
সেখানে প্রদাহ হয়। এই প্রদাহের
বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া বা জীবানু
রক্তের মাধ্যমে হার্টের মধ্যেও চলে
যায় ফলে তখন হার্টের অসুখ বা
স্ট্রোক এর মত মারাত্মক জটিল
রোগের সৃষ্টি হয়। অপরদিকে নিয়মিত
দাঁত ও মাড়ি পরিষ্কার ও সময়মত
চিকিত্সা করলে এই ঝুঁকি কমে যায়।
ইংরেজীতে একটি কথা বলা হয়
‘Your mouth is the window into the
health of the body’ পৃথিবীর বিভিন্ন
উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের
গবেষণাগারের মুখের বিভিন্ন রোগের
সাথে হূদরোগ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিস
এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার কাজ
দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। ব্রিটিশ
মেডিক্যাল জার্নাল এ প্রকাশিত
গবেষণা ছাড়াও পৃথিবীর আরো
অনেকে উন্নত দেশে গবেষণায় বলা
হয়েছে যে, মুখের বিভিন্ন রোগের
কারণে হূদরোগ, স্ট্রোক হওয়ার
সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
এর বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে প্রথম
মতবাদ হচ্ছে:
১. মুখ থেকে যে কোনো ভাবেই
ব্যাকটেরিয়া রক্তের সঙ্গে মিশে
গিয়ে হূদপিন্ডে চলে যেতে পারে
এবং হূদরোগ ঘটাতে পারে, অন্যটি
হচ্ছে-
২. মাড়ির রোগের কারণে বা দাঁতের
ক্যারিজে আক্রান্ত দাঁতের গোড়াতে
পুজ জমা থাকার কারণে
ব্যাকটেরিয়াগুলো রক্তের মাধ্যমে
হূদপিন্ডে চলে গিয়ে হূদরোগ ঘটাতে
পারে এবং যাদের মাড়ির রোগ আছে
তাদের হূদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা
অন্যান্য সুস্থ মাড়ির অবস্থাসম্পন্ন
মানুষের চাইতে দ্ব্বিগুন বেড়ে যেতে
পারে। মাড়ির স্ট্রোকের ক্ষেত্রেও
একই বিষয় ধরা পড়েছে।
আমি বিগত ৫ বত্সর বারডেম
হাসপাতালে ডেন্টাল বিভাগে ও একটি
গবেষণা কাজ পরিচালনা করেছি,
যেখানে CRP (C-Reactive Protein)
এর সাথে মাড়ির রোগের সম্পর্ক
নিয়ে ডায়াবেটিস রোগীদের উপর
একটি গবেষণা করে দেখেছি যে,
মাড়ির রোগের সাথে CRP বেড়ে
যাওযার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
যেহেতু মাড়িতে প্রদাহ জনিত কারণে
এই CRP স্বাভাবিকের (<৬) এর
চাইতে বেড়ে যায় সেহেতু হূদরোগ বা
করোনারী হার্টডিজিজ,
মাইয়োকার্ডিয়াল ইনফেকশান বা
স্ট্রোক এর ঝুঁকিও অতিরিক্ত
পরিমাণে বেড়ে যায়। অবশ্য এই
ধরনের গবেষণা কাজ ইতিমধ্যে
অন্যান্য দেশেও পরিচালিত হয়েছে
এবং সে সকল সমীক্ষায়ও বলা
হয়েছে যে মাড়ির রোগের সাথে CRP
বেড়ে যাওয়ার ফলে করোনারী হার্ট
ডিজিজ এর ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
গবেষণা কাজটি বিগত আন্তর্জাতিক
ডায়াবেটিস সম্মেলনেও আমরা
বারডেম থেকে উপস্থাপন করেছি।
অতএব মুখের ভিতরে কোনো ধরনের
প্রদাহ বিশেষত মাড়ির রোগ
(পেরিওডেন্টাল ডিজিজ) যাতে না
থাকে সেদিকে নজর দিতে হবে।
অথাত্ মাড়িকে যেমন সুস্থ
স্বাভাবিক রাখতে হবে তেমনি দাঁতেও
যাতে ডেন্টাল ক্যারিজ (ক্ষয় রোগ)
না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
মোট কথা মাড়িতে বা দাঁতে ডেন্টাল
প্লাক যাতে না জমে সেদিকে খেয়াল
রাখতে হবে। এবং এর জন্য দুটি
বিষয় গুরুত্ব সহকারে পালন করতে
হবে, যেমন-
১. প্রতিদিন সকালে নাস্তা খাওয়ার
পর ও রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ
ও একটি মাউথ ওয়াশ (Clorohesidine)
ব্যবহার করা।
২. প্রতি ছয় মাস অন্তর একজন
ডেন্টাল সার্জন কে দিয়ে মুখ ও দাঁত
পরীক্ষা করানো যাতে নিয়মিত
স্কেলিং এর মাধ্যমে দাঁতের ও মাড়ির
সংযোগ থেকে ডেন্টাল প্লাক
পরিষ্কার হয় ও ক্যারিজ আক্রান্ত
দাঁতকে ভর্তী বা ফিলিং করানো যায়
সেই সাথে মুখ অন্যান্য কোনো
কারণে প্রদাহ থাকলে তাও দূর করা
যায় যেমন আক্কেল দাঁত, মুখের ঘা
ইত্যাদি।
মাড়ির রোগ দীর্ঘদিন পুষে রাখলে
যেমন মাড়িতে প্রদাহ বা ইনফেকশন
হয় তেমনি দন্তক্ষয় বা ডেন্টাল
ক্যারিজ রোগ দীর্ঘদিন বিনা
চিকিত্সায় থাকলে দাঁতের গোড়ায়
পূঁজ জমা হয়। মুখের এই ধরনের
রোগের কারণে যেমন মুখে
স্থানীয়ভাবে অসুবিধার সৃষ্টি হতে
পারে তেমনি দেহের জন্য বিপদ নিয়ে
আসতে পারে। যেহেতু দাঁত ও মাড়ির
সঙ্গে দেহের রক্ত চলাচলের সম্পর্ক
আছে, তাই ইনফেকশন রক্তের সঙ্গে
গিয়ে হূদপিন্ড (Heart), মস্তিষ্ক
(Brain), হাড় (Bone), সন্ধি (Joint),
বৃক্ক (Kidney), যকৃত (Liver) ও
চর্মের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
মুখের সংক্রমণ জাতীয় এই ধরনের
রোগের কারণে যে সমস্ত রোগ সৃষ্টি
হতে পারে বা রোগটিকে আরও
ত্বরান্বিত ও দির্ঘায়ীত করতে পারে,
সেগুলো হলো-
১. হূদরোগ
২.বাত রোগের সন্ধি প্রদাহ
৩. কিডনি রোগ
৪. চর্ম রোগ
৫. মস্তিষ্কের রোগ
৬. নাক, কান, কলার রোগ
৭. উচ্চ রক্তচাপ
৮. কিডনি রোগ
মুখের রোগের কারণে দেহে এই সমস্ত
জটিলতা দেখা দিতে পারে বলেই
মুখের ও দাঁতের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত
প্রয়োজনীয়।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা
যাদের দেহে মুখের সমস্যা ছাড়াও
অন্যান্য রোগের উপস্থিতি আছে
তাদের করণীয়-
১. নিয়মিত দুই বেলা সকালে ও রাতে
আহারের পর দাঁত ও মাড়ি পরিষ্কার
করা প্রয়োজন তবে অসুস্থরোগীদের
নিজের করতে অসুবিধা বিধায় তাদের
অন্যের সাহায্য নিয়ে তা করানো
প্রয়োজন।
২. দাঁতের অথবা মাড়ির প্রদাহ থাকলে
তা চিকিত্সার মাধ্যমে সুস্থ করা
প্রয়োজন, কারণ প্রদাহ দেহে ছড়িয়ে
পড়তে পারে।
৩. নিয়মিত একটি জীবণুনাশক ওষুধ
(মাউথ ওয়াশ) দিয়ে মুখ কুলিকুচি করা
প্রয়োজন (বিশেষত:রাতের আহারের
পর, ঘুমানোর আগে)
৪. কোন অনুপস্থিত দাঁত থাকলে তা
কৃত্রিম দাঁতের মাধ্যমে স্থান পূরণ
করা প্রয়োজন।
৫. দন্ত চিকিত্সকের নিকট মুখ ও
দাঁতের রোগের চিকিত্সার পূর্বে
দেহের অন্যান্য রোগের উপস্থিতি
অবহিত করা প্রয়োজন, কারণ)
ডেন্টাল সার্জারির পূর্বে
এন্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ যেমন
জরুরী তেমনি দেহের স্বাভাবিক
অবস্থা পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে
নিশ্চিত করাটাও অত্যাবশ্যক।
৬. বছরে অন্তত: দু’বার একজন
দন্তরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্যে
মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো
প্রয়োজন।
৭.চিকিত্সার পূর্বে জীবাণুমুক্ত
যন্ত্রপাতি, একবার ব্যবহার যোগ্য
সূঁচ, ইত্যাদির ব্যবস্থা সম্পর্কে
সচেতন থাকা প্রয়োজন।
৮. হূদরোগ, ডায়াবেটিস ও
কিডনিরোগ থাকলে বিশেষজ্ঞ
চিকিত্সক ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞের
পারস্পরিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে
চিকিত্সার ব্যবস্থাপত্র কার্যকর
করাটাই নিরাপদ।
লেখক: অধ্যাপক ড. অরূপ রতন
চৌধুরী, সিনিয়র কনসালটেন্ট ও
বিভাগীয় প্রধান, ডিপার্টমেন্ট অব
ডেন্টিষ্ট্রি, বারডেম হাসপাতাল ও
ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন